সর্বশেষ শিরোনাম

শাবি শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা

Bookmark and Share
01_262957

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গতকাল রবিবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-২ (উপাচার্য ভবন)-এর সামনে এ ঘটনা ঘটে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা গতকাল সকালে সেখানে অবস্থান করতে গেলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাঁদের ওপর চড়াও হয় এবং ব্যানার কেড়ে নেয়। নেতাকর্মীরা শিক্ষকদের মারধর করে, ধাক্কাধাক্কি করে মাটিতে ফেলে দেয়; নানাভাবে লাঞ্ছিত করে। হামলায় অন্তত ১০ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন।

শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আজ সোমবার শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন ঘণ্টা কর্মবিরতি, র‌্যালি, সমাবেশ ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূটি ঘোষণা করেছে আন্দোলনরত ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ’। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের হামলার শিকার আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতা ফারুক উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা হতভম্ব। যে ছেলেদের আমরা পাঠদান করছি, তারা আমাদেরকে মারধর করবে, লাঞ্ছিত করবে- এটা কোনোভাবেই চিন্তা করিনি।’ তিনি বলেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষকদের কিল-ঘুষি মেরেছে এবং ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়ার মতো কাণ্ড ঘটিয়েছে। অধ্যাপক ড. ইউনুসকে রীতিমতো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাঁকে জাপটে ধরে রক্ষা করেন।’ অনেকের হাত-পা কেটে গেছে বলে তিনি জানান। ড. ইয়াসমিন হককে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাঁর মতো একজন সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বঘোষিত একাডেমিক কাউন্সিল ঠেকাতে গতকাল সকাল ৯টা থেকেই প্রশাসনিক ভবন-২ (উপাচার্য ভবন)-এর সামনে অবস্থান কর্মসূচি ছিল আন্দোলনকারী মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদের।

অন্যদিকে শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচি ঠেকাতে ভোর সাড়ে ৫টা থেকেই একই স্থানে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। পরে সকাল সাড়ে ৭টায় আন্দোলনকারী ১০-১২ জন শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাঁদের বাধা দেয়। দুই পক্ষে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ‘শাবিপ্রবির মাটি/ছাত্রলীগের ঘাঁটি’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা শুরু করে। ছিনিয়ে নেয় শিক্ষকদের ব্যানার। নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন আন্দোলনকারী শিক্ষক ড. ইয়াসমিন হক, দীপেন দেবনাথ, সৈয়দ সামসুল আলম, মো. ফারুক উদ্দিন, মোস্তফা কামাল মাসুদ, মোহাম্মদ ওমর ফারুকসহ অন্তত ১০ জন। হামলায় হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন অধ্যাপক ড. মো. ইউনুস।

এ সময় ছাত্রলীগকর্মীরা নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী বলে দাবি করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি আবু সাঈদ আকন্দ, সহসভাপতি অঞ্জন রায় ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম সবুজসহ কয়েকজন নেতাকে সেখানে উপস্থিত দেখা যায়। তারাসহ ২০-২৫ জন নেতাকর্মী শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায়। ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান খানকে এ সময় দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, ছাত্রলীগকর্মী ধনী রাম রায়, আব্দুল বাতেন তন্ময়, আরিফুর রহমান রনি, আব্দুস সালাম মঞ্জু, কামরুল ইসলাম, জুয়েল, আরিফুর রহমান কেনেডি, ফয়সাল আহমদ, তমাল ও জাহিদ সরাসরি শিক্ষকদের আক্রমণ করে।

শিক্ষকদের ওপর হামলা শুরু হলে সেই ফাঁকে উপাচার্য সিঁড়ি বেয়ে তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে যান। হামলার সময় পাশেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক রাশেদ তালুকদার, প্রক্টর কামরুজ্জামান এবং উপাচার্যপন্থী সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষককে।

আন্দোলনরত মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক সৈয়দ সামসুল আলম বলেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে। উপাচার্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তাঁদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজে এবং অধ্যাপক ইয়াসমিন হক ছাড়াও শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল গণি, অধ্যাপক এ ন ক সমাদ্দার, মোস্তফা কামাল মাসুদ, সহযোগী অধ্যাপক মো. ফারুক উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক মারধরের শিকার হয়েছেন বলে তিনি জানান।

হামলার শিকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক বলেন, ‘ওরা দুই দফায় শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায়। ওরা শিক্ষকদের হাত থেকে ব্যানার কেড়ে নেয় এবং প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়ির কাছে শিক্ষকদের শারীরিকভাবে অ্যাসাল্ট করে।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিনষ্টের জন্য উপাচার্যকেই দায়ী করেন।

তবে শিক্ষকদের ওপর হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের কেউ জড়িত নয় বলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ২টায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি অঞ্জন রায়ের দাবি, ছাত্রলীগ কোনো হামলার ঘটনা ঘটায়নি। এখানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকদের পৃথক কর্মসূচি চলছে। উপাচার্য ভেতরে যেতে চাইলে আন্দোলনরত শিক্ষকরা বাধা দেন এবং ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ফেলে দেন। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে তাঁর কার্যালয়ে ঢুকিয়ে দেয় মাত্র।

উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভুঁইয়া দাবি করেন, ছাত্রলীগ বা যারা বাধা দিয়েছে এদের কারো সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

এদিকে উপাচার্যের অপসারণ এবং শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে নতুন কর্মসূচি দিয়েছে আন্দোলনে থাকা ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ’। আজ সোমবারের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো ব্যাজ ধারণ, সকাল ১০টায় র‌্যালি, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি এবং দুপুর ১২টায় উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ। পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক সৈয়দ সামসুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নিন্দা ও উদ্বেগ আসকের : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়।

 

Bookmark and Share

Comments are closed.