সর্বশেষ শিরোনাম

২০ মার্চ মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান প্রয়ান দিবস

Bookmark and Share

“মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।রাজনীতিনিষ্ঠ খাঁটি মানুষের প্রতিকৃতি”

 

index

ফরহাদ হোসাইন মিঠু : জিল্লুর রহমান। একটি নাম, একটি অনন্য ব্যক্তিসত্তার পরিচয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ আদর্শবাদী রাজনীতিবিদের উজ্জ্বল প্রতিকৃতি। তাঁর ব্যক্তিজীবন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল রাজনীতির গভীরে। জীবনভর তিনি ছিলেন রাজনীতিনিষ্ঠ একজন খাঁটি মানুষ। রাজপথই ছিল তাঁর ঠিকানা। কর্মী হিসেবে শুরু করে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। চল্লিশের দশকে দেশভাগের সময় থেকে শুরু করে এ দেশের প্রতিটি অধিকার আদায় ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি জড়িয়ে ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। বহু আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন একেবারে সামনে থেকে। আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি করার সুবাদে দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছেই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। সবাইকেই শোকসাগরে ভাসিয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যু।

জিল্লুর রহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ঢাকা (ইন্টারমিডিয়েট) কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি প্রথম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংস্পর্শে আসেন। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে জিল্লুর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনে। মূলত এই ভাষা আন্দোলন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রা। ১৯৪৮ সালের মার্চে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়ার পর প্রতিবাদ-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দিন পল্টন ময়দানের সভায় আবারও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরে ধর্মঘটসহ যেসব কর্মসূচি পালিত হয় তাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জিল্লুর রহমান।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সে সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস করা হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে তৎকালীন ফজলুল হক হল আর ঢাকা হলের মাঝখানের পুকুর পাড়ে বসে যে ১১ ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জিল্লুর রহমান তাঁদের অন্যতম। একুশে ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ছাত্রসভা এবং ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নামা মিছিলেও ছিলেন জিল্লুর রহমান।

১৯৫৩-৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত ইসলামিক সম্মেলনে বক্তারা বাংলা ভাষার প্রতি কটাক্ষ করলে জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্ররা ওই সম্মেলন কেন্দ্র ঘেরাও করে। ফলে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়। ওই আন্দোলনের কারণে জিল্লুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর এমএ ডিগ্রি। যদিও ছাত্র আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ পরে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়।

ঢাকা (ইন্টারমিডিয়েট) কলেজে অধ্যয়ন শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্সসহ এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি নিয়ে ১৯৫৪ সালে

বাবাকে অনুসরণ করে আইন পেশায় যোগ দেন জিল্লুর রহমান। তবে আইনজীবী হওয়ার চেয়ে তাঁর ঝোঁক বেশি ছিল রাজনীতিতে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতিবিদ হিসেবে এ দেশের স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন জিল্লুর রহমান। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

জিল্লুর রহমান সেই বিরল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গেও একই দায়িত্ব পালন করেছেন।

জিল্লুর রহমান সেই বিরল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যেমন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গেও একই দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৭২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই পদে পুনর্নির্বাচিত হন ‘৭৩ সালে। প্রায় দুই দশক পর সেই একই ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা খুঁজে পান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

১৯৯২ সালে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য জিল্লুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাচা বলে ডাকতেন। আওয়ামী লীগে তাঁর অবস্থান ছিল অভিভাবকের মতো।

১৯৭২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই পদে পুনর্নির্বাচিত হন ‘৭৩ সালে। প্রায় দুই দশক পর সেই একই ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা খুঁজে পান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৯২ সালে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য জিল্লুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাচা বলে ডাকতেন। আওয়ামী লীগে তাঁর অবস্থান ছিল অভিভাবকের মতো।

জিল্লুর রহমান ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর-ভৈরব আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতিক জিল্লুর রহমানের বিয়েতেও রাজনীতি প্রাধান্য পায়। অভিজাত পরিবারের সন্তান আইভী রহমানের সঙ্গে দল করার সূত্রে পরিচয়, এরপর পরিণয়। তবে তাঁদের দুজনকে এক করতে দুই পরিবারকে রাজি করাতে উদ্যোগ নিতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চার বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের নজিরও ছিলেন জিল্লুর রহমান। নিজের দুঃসময় উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি।

২০ মার্চ আপনার প্রয়ান দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।জাতীয় জীবনে এই মূহূর্তে আপনার অভিভাবকত্ব যখন আরও বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই আপনি চলে গেলেন।আপনাদের দিয়ে যাওয়া দেশটি যখন স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শকুনের কড়াল থাবায় আবারও ক্ষতবিক্ষত ঠিক তখন আপনার বটবৃক্ষের মতো ছায়া জাতির বড় বেশি প্রয়োজন ছিল, অথচ আপনি সেই ছায়া গুটিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।ইতিহাসের ত্রিকালদর্শী সাক্ষী হয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে মৃত্যুর আগ পরযন্ত আপনি ছিলেন আমাদের রাষ্ট্রপিতা। আপনার মত গুণী ব্যক্তির অভিভাবকত্বে আমরা ছিলাম ধণ্য। আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমাদের।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা পরিস্থিতির কাছে নতিস্বীকার করে আওয়ামী লীগকে সংস্কারের নামে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলেও জিল্লুর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন এবং দলের ঐক্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিল্লুর রহমান।

প্রায় সাত দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি কঠিন দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার। পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যা যেমন তাঁকে বেদনাক্লিষ্ট করেছে, নিক্ষিপ্ত করেছে কারান্তরালে; তেমনি প্রত্যক্ষ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় দলের ২৪ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে হারিয়েছেন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের চিরসঙ্গী প্রিয়তম সহধর্মিণীকে। ওই ক্ষত বুকে নিয়েই তিনি বঙ্গভবনে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন শেষ বয়সে। স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে অনেকটাই ভেঙে পড়েন জিল্লুর রহমান। তবে রাজনীতিতে সক্রিয়তা নষ্ট হয়নি তাঁর। তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। ছেলে নাজমুল হাসান পাপন বর্তমানে সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি।

২০ মার্চ ২০১৩ বিকেলে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সবাইকে শোকের সাগরে ভাঁসিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আপনার প্রয়ান দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।।

 

Bookmark and Share

Leave a Reply

Your email address will not be published.


seven − = 6

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>