সর্বশেষ শিরোনাম

কেন নির্যাতন!

Bookmark and Share

images (5)সংবাদসময়২৪.কম:

পরিবারের সদস্যরাও গৃহকর্মী 
আমাদের সমাজে এখনও পুরোপুরি  মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতা  আয়ত্ত করতে পারেনি। কার প্রতি কী আচরণ করাটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে সেটিও আমাদের সমাজ প্রায় সকল লোক ভুলে যাওয়ার অভ্যাসে গা ভাসিয়ে দিই। দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের মধ্যে সমন্বিত অভ্যাসের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সমাজের অনেক অন্যায়-অবিচার বিলুপ্ত হয়ে যেত। গৃহকর্মী নিগৃহের ঘটনা হরহামেশাই আমাদের দেখতে বা শুনতে হতো না।
সকালের খবর-এ গৃহকর্মী নির্যাতনের একটি খবর বেরিয়েছে। আট বছরের এক শিশু কর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে চুয়াডাঙ্গার সদর থানা পুলিশ রাজধানীর ধানমণ্ডি থেকে গ্রেফতার করেছে এক দম্পতিকে। তাদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী আসমা-উল হুসনাকে অকারণে মারধর, গরম কড়াই ও খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়াসহ বিভিন্ন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতার জায়াটি ডাক্তার আর পতিটি প্রকৌশলী। নির্যাতিত গৃহকর্মীর আত্মীয়স্বজন অভিযোগ করেছে, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও এই দম্পতি শিশুটিকে প্রয়োজনীয় খাবার দিত না। খিদের তাড়নায় মেয়েটি কিছু খেলে তার ওপর চলত অকথ্য অত্যাচার।
গৃহকর্মী নির্যাতনের এসব অভিযোগ নতুন কিছু নয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে এখনও প্রভু-ভৃত্যের সীমারেখা উত্কটভাবে বিরাজ করছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রচলিত দাস প্রথা এখন টিকে নেই, এটি যেমন সত্য, অন্য সত্যটি হচ্ছে আমাদের সমাজে ভিন্ন নামে, পরিবর্তিত রূপে শ্রমদাস এখনও রয়ে গেছে। এক সময় এ দেশে জমিদার প্রথা চালু ছিল। যারা জমিদার তারা ছিলেন প্রশ্নাতীত কুলীন। আর যারা প্রজা, তাদের নিয়তিই ছিল শোষিত হওয়া। রাজা-জমিদারদের বাড়িতে ফাইফরমাশ থেকে শুরু করে সব খাটাখাটুনির কাজ যারা করত, তাদের না ছিল কোনো অধিকার, না ছিল মনুষ্য পদবাচ্যের সম্মান। শওকত ওসমানের কালজয়ী উপন্যাস ক্রীতদাসের হাসি আমাদের অনেকেরই পড়া। ক্রীতদাস হাসবে কেন! তারা তো জন্মেছে কাঁদার জন্য!
বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ-মানসে কিছু পরিবর্তন এসেছে বটে। এখন আর দাস কিনতে পাওয়া যায় না। এরপরও নিজেদের প্রয়োজনেই গৃহকর্মী নিয়োগের চল রয়েছে। গ্রামে আছে, শহরেও উচ্চ বা মধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মী থাকে। রাত-দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই তাদের কাজ। বিনিময়ে সামান্য বেতন আর খাওয়া-পরা। এই সামান্য সুযোগ প্রাপ্তিতেও যখন টান পড়ে তখন নিয়োগদাতাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গৃহকর্মীদের অধিকাংশই হয় বালক বয়সী। যে বয়সে শিশুরা বিদ্যালয়ে যায়, হাসি-খুশিতে সময় পার করে, সেই বয়সে গৃহকর্মী হয়ে হতভাগ্যরা রাতদিন কায়িক পরিশ্রম করে থাকে।
যে কাজ করে, তার ভুলও হতে পারে। গৃহকর্মীদের কাজের ভুল বা ক্ষুধা নিবৃত্তির অপরাধে নির্যাতনের শিকার হতে হবে, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। চুয়াডাঙ্গার যে দম্পতির বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, তারা সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির নাগরিক। তাদের গৃহকর্মী নির্যাতন সমাজের একটি অসার দিককেই প্রকট করে। গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে দম্পতিটি গ্রেফতার হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তিও হয়তো হবে। এমন ঘটনা এর আগেও বহু ঘটেছে। গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা কমেছে, এমন পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। সমাজ নিজে নিজে সচেতন হবে বা বদলে যাবে, এমন আশা নেই। সমাজ-মানসের ভেতর এবং বাইরে থেকে পরিবর্তিত হতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তনটা এ ক্ষেত্রে জরুরি।
গৃহকর্মীরা পরিবারেরও সদস্য। শুধু আইন মান্যের জন্য নয়, তাদের অধিকারটুকু গ্রাহ্য করতে হবে মানবিকতার দায়িত্ববোধ থেকেও।

Bookmark and Share

Leave a Reply

Your email address will not be published.


× 3 = twelve

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>